প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রাণঘাতী কোনোভাবেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাই আমাদের আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। আমি জানি এর ফলে অনেকেরই জীবন-জীবিকায় অসুবিধা হবে। কিন্তু আমাদের সকলকেই মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন সর্বাগ্রে। বেঁচে থাকলে আবার সব কিছু গুছিয়ে নিতে পারবো।
 
 
মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় দেশবাসীকে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানান তিনি।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর করোনাভাইরাস আঘাত হানার পর আমাদের নানাবিধ বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই মহামারি প্রতিরোধে যেহেতু মানুষের সঙ্গ-নিরোধ অন্যতম উপায়, সে জন্য আমাদের এমন কিছু পদক্ষেপ করতে হয়েছে যার ফলে মানুষের জীবন-জীবিকার উপর প্রভাব পড়েছে।
 
গত বছর একটানা ৬২ দিন সাধারণ ছুটির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিতে পারিনি। বিদেশের সঙ্গে চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এই অবস্থা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের যেখানেই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ছে, সেখানেই এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
 
 
মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতি, মানুষের জীবন-জীবিকা যাতে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে না পড়ে সেদিকে আমরা কঠোর দৃষ্টি রাখছি। সবার সহযোগিতায় আমরা বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম, যার ফলে গত বছর করোনাভাইরাস মহামারিজনিত প্রভাব আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।
 
তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গত বছর আমরা চারটি মূল কার্যক্রম নির্ধারণ করেছিলাম। চারটি কার্যক্রম হচ্ছে:
 
১. সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা: সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘কর্মসৃজনকেই’ প্রাধান্য দেওয়া;
 
২. আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ প্রণয়ন: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল রাখা এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা;
 
৩. সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি: দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণ, দিনমজুর এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত জনসাধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি;
 
 
৪.মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা: অর্থনীতির বিরূপ প্রভাব উত্তরণে মুদ্রা সরবরাহ এমনভাবে বৃদ্ধি করা যেন মুদ্রাস্ফীতি না ঘটে।
 
 
এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে আমাদের কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকার ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। কলকারখানায় যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয় সে ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছি।
 
আমরা দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, হকার, রিকশাওয়ালা, দোকান কর্মচারী, স্কুলশিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিন, অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবাদানকারী, সাংবাদিকসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষকে সহায়তা দিয়েছি। প্রায় আড়াই কোটি মানুষকে বিভিন্ন সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
 
ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি জেলায় করোনাভাইরাস রোগীর চিকিৎসা সুবিধার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ এবং বিদ্যমান আইসিইউ সুবিধা আরও বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
 
কোভিড-১৯ মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গণ টিকাদান শুরুর কথাও বলেন তিনি। ইতোমধ্যেই ৫৬ লাখের বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে। যারা প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরু হয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে দেশের সকলকে টিকার আওতায় নিয়ে আসব। আমাদের সে প্রস্তুতি রয়েছে।
 
তবে টিকা নিলেই যে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত হবেন, তেমন না ভাবার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিকা নেয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। প্রত্যেকের কাছের মানুষদের সুরক্ষিত রাখতে যার যার নিজের ভাইরাস সংক্রমণ এড়িয়ে থাকার উপর জোর দেন তিনি।
 
সরকার যে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে, তা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে মহামারীও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
 
তিনি বলেন, যুগে যুগে মহামারি আসে, আসে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা, দুর্যোগ-দুর্বিপাক। এসব মোকাবিলা করেই মানবজাতিকে টিকে থাকতে হয়। জীবনের চলার পথ মসৃণ নয়। তবে পথ যত কঠিনই হোক, আমাদের তা জয় করে এগিয়ে যেতে হবে।
 
 
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি’ পচা অতীত/গিরি গুহা ছাড়ি’ খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত।/সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর বীর্যবান/তাজা জীবন্ত সে নব সৃষ্টি শ্রম-মহান।/
 
বাঙালি বীরের জাতি এবং নানা প্রতিকূলতা জয় করেই টিকে রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের এই মহামারিও আমরা ইনশাআল্লাহ মোকাবিলা করবো। নতুন বছরে মহান আল্লাহর দরবারে তাই প্রার্থনা, বিশ্বকে এই মহামারির হাত থেকে রক্ষা করুন।